হিরু হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেফতার

মোঃ আশরাফুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ.

মানিকগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন গঙ্গাধর পট্টি এলাকা হতে দীর্ঘ ১১ বছর ছদ্মবেশে পলাতক থাকা হিরু হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী আঃ রহমান(৩২) কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪ ।
সোমবার ২২ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর সিপিসি-৩ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে অভিযান পরিচালনা করে আঃ রহমান’কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান এর একটি পিকআপ ছিল এবং সে পেশায় একজন পিকআপ চালক। একই গ্রামের ভিকটিম হিরু বিভিন্ন পেশায় কাজ করতো। ভিকটিম হিরু আসামী আঃ রহমান এর পিতার নিকট থেকে বিভিন্ন সময়ে পিকআপ ভাড়া নিত। কিন্তু গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান তার পিতাকে ভিকটিম হিরু এর নিকট পিকআপ ভাড়া দিতে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে একদিন ভিকটিম হিরু গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান এর পিতার নিকট হতে পিকআপ ভাড়া আনতে গেলে সে পিকআপ ভাড়া দিবে না বলে জানায়। ভিকটিম হিরু জানতে পারে যে গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান হিরুর নিকট পিকআপ ভাড়া নিতে নিষেধ করছে। এই বিষয় নিয়ে ভিকটিম হিরু গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান’কে রাস্তায় পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং উভয় এর মধ্যে কথা কাটাকাটি ও মারামারি হয়। এই ঘটনার পর থেকে গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান ভিকটিম হিরু এর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে এবং গোপনে হিরুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। গত ইং ২২/০৯/২০১০ তারিখ আসামী আঃ রহমান পিকআপ চালিয়ে মিতরা বাস স্ট্যান্ড হতে ভাঙ্গালা বাজারে যাওয়ার পথে সিংগাইর থানাধীন আমতলী নামক বাস স্ট্যান্ড এর কাছাকাছি পৌঁছালে ধৃত আসামী আঃ রহমান দুর থেকে ভিকটিম হিরুকে পাঁকা রাস্তার উপর দেখিতে পেয়ে হিরুকে হত্যার উদ্দেশ্যে পিকআপটি সজোড়ে গায়ে উঠাইয়া দিলে ভিকটিম হিরু রাস্তার উপর পড়ে গুরুতর যখম প্রাপ্ত হয়। স্থানীয় লোকজন ভিকটিম হিরুকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত ডাক্তার ভিকটিম হিরুকে মৃত বলে ঘোষনা করে। উক্ত ঘটনায় ভিকটিম হিরু এর স্ত্রী মোসাঃ মেহেরজান বাদী হয়ে আসামী আঃ রহমান ও মোঃ ইউনুছ (৩৫) দ্বয়ের বিরুদ্ধে সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। যার মামলা নং-২০ তারিখঃ ২৩/০৯/২০১০ ধারা- ৩০২ পেনাল কোড। পরবর্তীতে উক্ত মামলার আসামী আঃ রহমান ও ইউনুছ দ্বয়কে থানা পুলিশ গ্রেফতার করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। গ্রেফতারকৃত আসামী আঃ রহমান ও মোঃ ইউনুছ ০৪ মাস জেল হাজত বাস করে জামিনে মুক্তি পায়। মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামী আঃ রহমান এর বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট প্রদান করে এবং অন্য আসামী মোঃ ইউনুছ’কে চার্জশিট থেকে অব্যহতি প্রদান করে। পরবর্তীতে চার্জশিটের ভিত্তিতে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত, মানিকগঞ্জ এর বিজ্ঞ বিচারক উক্ত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ভিকটিম হিরু হত্যাকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ইং ০২/০৯/২০২১ তারিখে চার্জশীটে অভিযুক্ত আসামী আঃ রহমান’কে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন। উক্ত ঘটনার পর হতে আসামী আঃ রহমান দীর্ঘ ১১ বছর পলাতক ছিলো।
আসামীর জীবন বৃত্তান্তঃ
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আসামী ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানাধীন কালিয়াকৈর এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। দুই ভাই এর মধ্যে সে সবার বড়। সে নবগ্রাম বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত লেখা-পড়া করে। ব্যক্তিগত জীবনে আসামী বিবাহিত এব বর্তমানে আসামী আঃ রহমান তার স্ত্রী মদিনা (২৮)’কে নিয়ে মানিকগঞ্জ জেলার মানিকগঞ্জ সদর থানাধীন গঙ্গাধর পট্টি এলাকায় বসবাস করে আসছিলো। বর্তমান তার পরিবারে রুবি (১১) ও মাইমুনা (০৪) নামের দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
আত্মগোপনে থাকাকালীন সময় আসামীর জীবনযাপনঃ আসামী জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পর এই মামলায় সে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে লোক চক্ষুর আড়ালে সে নিজেকে আত্মগোপন করে। পরিচিত লোকজন থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখার জন্য ঘটনার পর ঢাকা চলে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০১৯ সালের শেষের দিকে আসামী আঃ রহমান প্রবাসে চলে যায়। গত ১১ বছর ধরে আসামী আঃ রহমান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহ প্রবাসে(ব্রুনাই) আত্মগোপনে ছিল। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আসামী নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য ক্রমাগতভাবে সে পেশা পরিবর্তন করে আসছিলো। প্রথমদিকে সে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি, বাস ও ট্রাক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো।
গ্রেফতারকৃত আসামীকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর কার্য়ক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।

উল্লেখ্য যে; র‌্যাবপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব এলিট ফোর্স হিসেবে আত্মপ্রকাশের সূচনালগ্ন থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নির্মূলের লক্ষ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল ও মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই চক্রের সাথে জড়িত বিভিন্ন সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার করে সাধারণ জনগণের মাঝে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জোড়ালো তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে ।
র‌্যাব-৪ বিগত দিনগুলোতে চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকান্ডের আসামী গ্রেফতার যেমনঃ সাভারের অধ্যক্ষ মিন্টু চন্দ্র বর্মন হত্যার রহস্য উদঘাটনপূর্বক আসামীদের গ্রেফতার, চাঞ্চল্যকর শাহীন উদ্দিন হত্যা মামলার আসামীদের গ্রেফতার, সাভারের ক্লুলেস ফাতিমা হত্যা রহস্য উদঘাটনসহ অসংখ্য ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে যার প্রেক্ষিতে সার্বিক মূল্যায়নে ২০২১ সালে র‌্যাব -৪ ক্লুলেস অপরাধ রহস্য উদঘাটনে প্রথম স্থান লাভ করে। এছাড়াও র‌্যাব -৪ বিভিন্ন মামলার পলাতক যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ছদ্মবেশী বেশ কয়েকজন দুদ্ধর্ষ খুনী, ডাকাত ও ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে; যার মধ্যে চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী জুলেখা (১৯) হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী সিরাজুল (৩৯)’কে ১৯ বছর পর, চাঞ্চল্যকর ইদ্রিস হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী নজরুল ইসলাম (৪২)’কে ০৭ বছর পর, ক্লুলেস ও চাঞ্চল্যকর অটোরিকশা চালক আলী নূর হত্যা মামলার মূল আসামী আহিনা খাতুন (২৯)’কে, চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতি’কে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেন (৪৭)’কে, চাঞ্চল্যকর সাইদুল ইসলাম হত্যা মামলার প্রধান আসামী নান্নু শেখ নূরনবীকে গ্রেফতার করা হয়। গত কয়েকদিন পূর্বে চাঞ্চল্যকর আগুনে পুড়িয়ে আম্বিয়া হত্যা মামলার দীর্ঘ ২১ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী আলম (৪০) কে ঢাকার বংশাল এলাকা হতে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *