শরতের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে”

মোঃ মাসুদ আলমঃ

বাঙালির সামনে শরতের অপার সৌন্দর্য উপস্থাপন করতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি, ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি’।বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ।প্রতি দুই মাস নিয়ে একটি ঋতু। ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদশ। প্রতিটি ঋতুর রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।আর এ বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতিটি ঋতু আলাদা।পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এরকম ঋতু বৈচিত্র্য দেখা যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর পরিবতর্ন হয়। পরিবর্তন হয় ঋতুর বৈচিত্র্যও। এর প্রভাব পড়ে সাহিত্যেও। নাগরিক জীবনের শরৎ উদযাপন ও গ্রামীণ জীবনে শরৎ উদযাপন এক নয়। সে যাই হোক, শরৎ প্রতি বছর বাঙালির জীবনে আসে নতুন আবেদন ও আবহ নিয়ে। শরতে মুগ্ধ হয়ে কবিরা সাদা সাদা পৃষ্ঠায় অক্ষরের মালা গেঁথে লেখেন কবিতা। এভাবেই চলে এসেছে হাজার বছর এবং আগামীতেও যে তা চলবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
ঋতু-রঙ্গমঞ্চে যখন অগ্নিখরা গ্রীষ্মের আতঙ্ক, যখন বষার্র বিষণ বিধুর নিঃসঙ্গতা আর নেই তখনই নিঃশব্দে চরণ ফেলে চলে আসে শরৎ। ঝিমানো প্রকৃতি হঠাৎই প্রাণ পেয়ে ফুরফুরে হয়ে ওঠে। সকাল, দুপুর, বিকেল, রাতে আসে শরতের ভিন্ন ভিন্ন রূপ।
সবুজ-শ্যামল আর পাখির গুঞ্জনে মুখরিত আমাদের প্রিয় স্বদেশ। অপূর্ব রূপ এবং অফুরান সম্ভার নিয়ে প্রতি বছর আবতির্ত হয় ছয়টি ঋতু। চিকচিক রোদের ভেতর ফসলের মাঠে বাতাসের দোল জীবনে এনে দেয় অমলিন হাসি। বষার্র বিদায়ক্ষণে শরতের আগমনে প্রকৃতি রঙ ছড়ায়। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এমনই সাজে সাজে প্রকৃতি, তাতে মন উড়ে যায় শুভ্র মেঘের নীল আকাশে। বিকেলের সোনাঝরা রোদের ঝলমলে হাসি আর সন্ধ্যার শান্ত আবছা শিশিরে মন উড়ে যায় অজানা নদীর ধারে মৃদুমন্দ বাতাস, কাশফুলের শুভ্রতা,হাঁসনাহেনার আকুল করা ঘ্রাণ,চাঁদনী রাত এ সবকিছু শরতের আবেদনকে আরও বাড়িয়ে তোলে। শরতে মানুষ ভুলে যায় ক্লান্তি ও যাপিতজীবনের নানান অসঙ্গতি। ঘাতপ্রতিঘাত ভুলে জীবন নদীতে সুখের নৌকা ভাসায় আপামর মানুষ। শরৎ তারুণ্যের হৃদয়কে নবযৌবন রাগে রাঙিয়ে দেয়। কাশফুল, শিউলি, কামিনী, দোলনচাঁপা, মল্লিকা, নয়নতারা, ছাতিম, সন্ধ্যামনি, শাপলা, মাধবীর আগমনে শরৎকাল হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। এমন শরতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতো আমরাও যেন বলে উঠি
‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ/আমরা গেঁথেছি শেফালীমালা/নতুন ধানের মঞ্জরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি বরণডালা।’
শরৎ-সন্ধ্যায় গ্রামের মেঠোপথে যেতে যেতে পথিকের মনে নতুন ভাবনার উদ্রেক হয়। শরৎ যেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে কবি-ভাবকে জাগ্রত করে দেয়। শরৎ নিয়ে মানুষের এমন মুগ্ধতা কয়েকশ’ বছরের নয়, এ মুগ্ধতা হাজার-হাজার বছরের। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল কুড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে।এবং সেই ফুল দিয়ে মালা গাঁথে। সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি যেন অপরূপ সৌন্দর্য্যের হাত ছানি দেয়।
লেখক ঃ মোঃ মাসুদ আলম
পরিচালক, দি চাইল্ড কেয়ার একাডেমি ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.